পঁয়ষট্টিতম অধ্যায় সমুদ্রবন্দর

রোমে বাতাস উঠল পেটের পেশি বিশিষ্ট প্রধান শিক্ষক 2336শব্দ 2026-03-20 04:54:28

অনেক দিন পরে এতটা আনন্দ উপভোগ করল মার্গারেট। ইউজেনের প্রতি তার ভালো লাগা ক্রমশই বাড়তে থাকল। উপরন্তু, চার্চের স্বীকৃতি পাওয়ায় অন্তত ইউজেনের অবস্থান যে নির্ভরযোগ্য, সেটাও প্রমাণিত হল। অতএব, মার্গারেটের আর ইউজেনকে অপছন্দ করার কোনো কারণই রইল না।

চার্চ থেকে শেনব্রুন প্রাসাদে ফেরার পথে, মার্গারেট বিশেষভাবে ইউজেনকে আমন্ত্রণ জানালেন তার সঙ্গে একই গাড়িতে চড়ার জন্য। পথজুড়ে তারা কথোপকথনে সময় কাটালেন, অনাবিল আনন্দে। এ যাত্রায় ইউজেন সব কথা একেবারে খুলে না বললেও, অন্তত প্রাথমিক অবস্থা সম্পর্কে মার্গারেটকে অবহিত করলেন। ফলে মার্গারেট ইউজেনের মাফিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের কারণ বুঝতে পারলেন এবং জানালেন, তিনি ডিউকের পক্ষ থেকে ইউজেনকে কিছু সমর্থন দিতে প্রস্তুত।

ইউজেনের আনন্দ আর ধরে না—এই আশ্বাস তার কাছে ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। মার্গারেটের নিশ্চয়তা পেলে পুরো ইতালিই যেন একজোট হয়ে যায়; মাফিয়া ও অভিজাতরা একত্রে ভয়ানক রোগের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোমর বেঁধে নামে।

শেনব্রুন প্রাসাদে ফিরে ইউজেনের কাছে এক দাস এসে একটি চিঠি দিল, সেটি মেসিনা থেকে পাঠানো ল্যাম্বোর চিঠি। চিঠিতে সংক্ষেপে অভিযানের পরিস্থিতি জানানো হয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে স্থানীয় অভিজাতদের সঙ্গে যোগাযোগ করে একত্রিত হয়ে রোগ প্রতিরোধ করার কথা বলা হয়েছে।

ইউজেন চিঠিটি মার্গারেটকেও দেখালেন। মার্গারেটের আর কোনো সন্দেহ রইল না। তিনি সঙ্গে সঙ্গে ফ্লোরেন্সে একটি চিঠি পাঠালেন, যাতে ইউজেনের অবস্থা বিস্তারিত লিখে পরিবারকে ইউজেনের উদ্যোগে সমর্থন দিতে অনুরোধ জানালেন।

সবকিছু সুন্দরভাবে নিষ্পন্ন হতে দেখে ইউজেন খুশিতে হাসলেন। হেইডেলবার্গের ব্যাপারটি তিনি মডেসালকে সঁপে দিয়েছেন, তাকে আর সেখানে যেতে হবে না। তিনি স্থির করলেন, কয়েকদিনের মধ্যে নিজে দক্ষিণে গিয়ে নিজের জমিদারিতে দুর্গ নির্মাণ শুরু করবেন, একই সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে উপস্থিত থেকে সরাসরি ব্ল্যাক ডেথের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করবেন।

...

সিসিলির বৃহত্তম বন্দর মেসিনা হঠাৎ দু’দিন আগে পুরোপুরি লকডাউন ঘোষণা করল। সব জাহাজের যাত্রা নিষিদ্ধ; ফিরে আসা জাহাজগুলোকে বন্দর-সীমার বাইরে নোঙর করতে বলা হল, তারা কোনোভাবেই বন্দরে ভিড়তে বা উপকূলে ওঠার অনুমতি পেল না।

এই খবরে গোটা মেসিনায় তীব্র আলোড়ন উঠল, বাজারে-বন্দরে গালিগালাজের ঝড় বয়ে গেল, এমনকি ক্ষুব্ধ জনতা বিদ্রোহের হুমকি পর্যন্ত দিল। শহরটি সমুদ্রনির্ভর বলে জাহাজ চলাচল বন্ধ হলে নাগরিকদের জীবিকা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়—তাই এত বড় প্রতিক্রিয়া স্বাভাবিক।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত সব বিদ্রোহের আওয়াজ স্তিমিত হয়ে এল, মানুষজন অসন্তুষ্ট হলেও কার্যত কোনো বড় ওলোটপালট ঘটল না।

এর কারণ, এই নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে স্থানীয় ছায়া সম্রাট—মাফিয়া।

এ মুহূর্তে ল্যাম্বো বন্দরের প্রান্তের পর্যবেক্ষণ চূড়ায় দাঁড়িয়ে চারদিকে জাহাজগুলোর অবস্থা নিরীক্ষণ করছেন। এখনো সবকিছু তাদের নিয়ন্ত্রণে, কোনো জাহাজ বেরোতে সাহস পায়নি।

বাইরের জাহাজগুলো বন্দর-সীমার বাইরে দু’দিনের বেশি অপেক্ষা করছে; যাত্রীদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা শেষে, রোগী না পাওয়া গেলে তবেই তাদের বন্দরে ঢোকার অনুমতি মিলবে।

এখন কিছু জাহাজ তিন দিন ধরে অপেক্ষা করছে, একে একে বন্দরের দিকে এগোতে শুরু করেছে।

ত্রিকোণ চোখ ল্যাম্বোর পাশে দাঁড়িয়ে, হাতে ছোট খাতা নিয়ে তুলনা করে বলল, ‘‘ল্যাম্বো স্যার, রেকর্ড অনুযায়ী এই মুহূর্তে প্রবেশ করা জাহাজগুলোর মধ্যে গাফা শহর থেকে আসা কোনো জাহাজ নেই, কোনো রোগীও নেই, তাই তারা বন্দরে ঢোকার অনুমতি পেয়েছে।’’

ল্যাম্বো মাথা নেড়ে সম্মতি জানালেন। তাদের উদ্দেশ্য রোগের প্রবেশ ঠেকানো, কাজেই শুধু রোগীরাই যেন ঢুকতে না পারে, সেটাই যথেষ্ট।

এই পদ্ধতি নিয়ে ল্যাম্বো ডন অফারুচির সঙ্গে পরামর্শ করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। একই সঙ্গে, ‘‘সন্দেহ হলে ছাড়ো না’’ মনোভাব নিয়ে সব জাহাজই আটকে রাখা হয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত মাত্র দু’টি জাহাজই গাফা শহর থেকে এসেছে।

এই দু’টি গাফা শহরের জাহাজের জন্য বিশেষ নজরদারি চলছে, তাদের পর্যবেক্ষণের সময় এক সপ্তাহ নির্ধারিত হয়েছে। এমন সময় দূর সমুদ্রে আবার একটি ছোট বিন্দু দেখা গেল—আরেকটি জাহাজ মেসিনায় ভিড়তে চলেছে।

ল্যাম্বো মনোযোগ দিয়ে দৃশ্যটি দেখছিলেন, এমন সময় ত্রিকোণ চোখের অধীনস্থ মোটা মাথাওয়ালা লোকটি হন্তদন্ত হয়ে পর্যবেক্ষণ চূড়ায় এসে বলল, ‘‘ল্যাম্বো স্যার, ভিয়েনা থেকে আপনার নামে একটি চিঠি এসেছে।’’

ল্যাম্বো তাড়াতাড়ি চিঠিটি নিয়ে দেখলেন, সিলমোহর দেখে বুঝলেন এটি ইউজেনের চিঠি। সঙ্গে সঙ্গে খাম খুলে কাগজ বের করে দ্রুত পড়া শুরু করলেন।

এসময় বন্দরে প্রবেশরত জাহাজগুলোর মধ্যে একটি ভেনিস থেকে আসা বহু-মাস্টের পালতোলা জাহাজ—গুনিভিয়ার। গুনিভিয়ার-এর ক্যাপ্টেন ডেকে দাঁড়িয়ে ল্যাম্বোদের দিকে রাগে চোখ রাঙাচ্ছিল, সামনে সমুদ্রের দিকে ঘৃণাভরে থুতু ফেলে দিল।

সে জানে, এই মাফিয়াদের কারণেই তার জাহাজ বন্দরে ঢুকতে পারছে না, বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। এই দুই দিনে তার কত যে সোনার মুদ্রা ক্ষতি হয়েছে, তার ঠিক নেই।

মনে মনে ক্যাপ্টেনের মাফিয়াদের প্রতি চরম ঘৃণা জন্মেছে।

পর্যবেক্ষণ চূড়ায় ল্যাম্বো চিঠি পড়ছিলেন, তার মুখ ক্রমশ বিবর্ণ হয়ে উঠল। ত্রিকোণ চোখ পাশে দাঁড়িয়ে ল্যাম্বোর মুখ লক্ষ করছিল, বুঝতে পারল কিছু একটা ঘটেছে। কিন্তু ল্যাম্বো কিছু বলছিলেন না বলে সে কিছু জিজ্ঞেস করতেও সাহস পেল না।

অবশেষে ল্যাম্বো চিঠি পড়া শেষ করলেন। তার পুরো শরীর কেঁপে উঠল, যেন পেছনে পড়ে যাবেন, মুখে যেন মহাপ্রলয়ের আশঙ্কা ফুটে উঠল।

ত্রিকোণ চোখ প্রশ্ন করতে যাচ্ছিল, হঠাৎ ল্যাম্বো ঝাঁপিয়ে উঠে বন্দরের দিকে চিৎকারে গর্জে উঠলেন, ‘‘ওই জাহাজগুলোকে থামাও! বন্দরে ঢুকতে দিও না! তাড়াতাড়ি আটকাও!’’

ল্যাম্বো যেন পাগলের মতো চিৎকার করতে লাগলেন, কোমরের তলোয়ার বের করে এক হাতে জোরে挥 করতে লাগলেন।

ত্রিকোণ চোখ ও অন্যান্যরা বিস্ময়ে থেমে গেলেও, সঙ্গে সঙ্গেই তার পাশে গিয়ে সেই চিৎকারে যোগ দিল। যদিও তারা জানত না কী ঘটেছে, তবুও ল্যাম্বোর আদেশ মানা ছাড়া উপায় ছিল না।

বন্দরে মাফিয়ার কিছু সদস্য জাহাজগুলোকে প্রবেশ করাতে দিকনির্দেশনা দিচ্ছিল। হঠাৎ ল্যাম্বোর নির্দেশ পেয়ে তারা কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তবে কিছুক্ষণ পরেই নেতারা জাহাজগুলোকে ফিরে যেতে বলল।

গুনিভিয়ার-এর ক্যাপ্টেন তখন রাগে ফেটে পড়ছিল, সে চিৎকার করে মাফিয়া সদস্যদের উদ্দেশে বলল, ‘‘তোমরা অভিশপ্ত বাঁদর, আর সহ্য করতে পারছি না! আমার জাহাজ এখনই বন্দরে ঢুকবে—তোমরা কেউ আটকাতে পারবে না।’’

তীরে থাকা মাফিয়া সদস্যরা দেখল, জাহাজগুলো নির্দেশ মানছে না। কোনো কথা না বলে তারা কোমর থেকে ছোট আগ্নেয়াস্ত্র বের করে সামনে থাকা জাহাজগুলোর দিকে গুলি ছুড়ল।

গর্জে উঠল কয়েকটি বিস্ফোরণ, সাগরের ওপর ধোঁয়ার আস্তরণ ছড়িয়ে পড়ল। যদিও এই সংক্ষিপ্ত আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি জাহাজ পর্যন্ত পৌঁছায়নি, তবুও শব্দে সবাই ভীত হয়ে গেল।

গুনিভিয়ার-এর ক্যাপ্টেন ভয় পেয়ে গেল, হঠাৎ মাফিয়ার ভীতিকর গল্পগুলো মনে পড়ল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে নাবিকদের জাহাজ ধীর করার নির্দেশ দিল।

‘‘দাঁড়াও, ওই জাহাজটা কী করছে? ওটা কেন গতি কমাচ্ছে না?’’—পর্যবেক্ষণ চূড়ায় দাঁড়িয়ে ল্যাম্বো হঠাৎ দেখতে পেলেন, একটি জাহাজ হুড়মুড়িয়ে বন্দরের দিকে এগোচ্ছে—এটাই সেই, দূর থেকে এগিয়ে আসতে দেখা জাহাজ।

পাশে ত্রিকোণ চোখ জাহাজটি দেখে মুহূর্তেই মুখ বিবর্ণ হয়ে কাঁপা গলায় বলল, ‘‘ল্যাম্বো স্যার, ওটা ‘স্তাসিয়া’, ওটা গাফা শহর থেকে এসেছে!’’