০৯৮: ষড়যন্ত্র আছে

এড়ানোও যায় না মুকুমু 2471শব্দ 2026-03-19 13:17:03

একটি জড়াজড়িতে নানতাও ঘামে ভিজে একাকার হয়ে গিয়েছিল। শেষমেশ হাত তোলার শক্তিও আর অবশিষ্ট রইল না, লুয়ে তাকে কোলে করেই স্নান করাতে নিয়ে গেল।

লোকটি যেন কোনো দুর্লভ রত্নকে স্পর্শ করছে, এমন যত্ন আর সতর্কতায় তাকে মুছছিল। নানতাওকে মুছে দিয়ে লুয়ে ঝরনার নিচে গিয়ে দাঁড়াল। জলীয় বাষ্পের আড়ালে তার দেহের দিকে তাকিয়ে নানতাওর চোখের কোণে লালচে আভা ছড়িয়ে পড়ল।

অচিরেই লুয়ে স্নান শেষ করে গামছা জড়িয়ে বেরিয়ে এল। ছোট ছোট চুলগুলো কপালে ছিটকে পড়ে ঝকঝকে কাঁচের কণার মতো দীপ্তি ছড়াচ্ছিল।

সে নানতাওর গায়ে হেলান দিয়ে তাকে তুলে নিল, আর নানতাও শুকনো তোয়ালে দিয়ে তার চুল মুছতে লাগল।

এখনও চুল পুরো শুকায়নি, তার আগেই তোয়ালেটা ছিনিয়ে নেওয়া হলো।

—আহা, কী করছ? এখনও ভালো করে শুকায়নি। ভেজা চুল নিয়ে শুলে মাথা ধরবে।

নানতাও বাধা দিয়ে তোয়ালে ফেরত নিতে গেল, কিন্তু দেখল লুয়ে ঘুরে আলমারি থেকে এক সেট কাপড় বের করেছে—ধূসর-সাদা হুডি আর ট্রাউজার। খুব তাড়াতাড়ি সেগুলো গায়ে চাপিয়ে সে মাথা ঝাঁকাল। কপালের চুলগুলো আলোয় ঢেউ খেলল, আর চুলের নীচে তার গভীর কালো চোখে ঝিলমিল হাসির রেখা ফুটে উঠল।

—আর শোব না।

বলে সে আবার আলমারি থেকে নানতাওর জন্য একই ধরনের আরেক সেট পোশাক বের করে দিল। হুডি এগিয়ে দিয়ে বলল, —পরে নাও।

—লুয়ে!

নানতাও জামাটা ছিনিয়ে নিল, কিন্তু পরল না। বিছানায় বসে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তার দিকে তাকাল। —তুমি তো আমাকে ঘুমাতে বলেছিলে।

—ঘুমের চেয়েও মজার কাজ আছে।

লুয়ে বিছানার পাশে এসে নানতাওর কোমর চেপে ধরল, তারপর কঠোর হাতে তার গায়ের রোগীর পোশাক খুলে নিয়ে হুডি গলিয়ে দিল। পরিয়ে শেষ করে সে ঝুঁকে তার কানের পাশে ফিসফিস করে বলল, —তুমি আমাকে একটু আগে এমনভাবে উত্তেজিত করেছ যে, এখন তো আরও ঘুম আসবে না।

—লুয়ে, তুমি... আহ!

কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটার হাত তার প্যান্টের পকেট টেনে নিল, আর নানতাওকে বাধ্য হয়ে আবার প্যান্ট বদলাতে হলো।

সব শেষ করতে করতে বাইরের ভোরের আলো তখন প্রায় ফুটে উঠেছে। নগরীর ইস্পাত আর সিমেন্টের জঙ্গলে রঙিন আলো ধীরে ধীরে মাথা তুলছিল, আর সাবধানে হাসপাতালের বারান্দার ওপর এক স্তর সোনালি রোদের চাদর বিছিয়ে দিচ্ছিল।

নানতাওর আর ঘুম রইল না। লুয়ে তাকে কোলে নিয়ে হাসপাতালের পার্কিং লটে নামিয়ে আনল।

পার্কিং লটে থরে থরে সাজানো গাড়িগুলো দেখে নানতাওর আবার গতরাতের মহাসড়কের সেই দৃশ্য মনে পড়ে গেল। লুয়ের গলায় জড়ানো তার হাত একটু শক্ত হয়ে গেল।

—ঢিলা করো।

লোকটি তা টের পেয়ে তার হাতের পিঠে আলতো চাপ দিল। —নিজের স্বামীকেই খুন করতে চাইছ নাকি?

—লুয়ে, সেই মহাসড়কের দুর্ঘটনায় সত্যিই তো কারও কিছু হয়নি, তাই না? —নিজের বেহিসাবি আচরণের জন্য এত বড় পরিণতি হয়েছে ভেবে নানতাওর বুক ভরে রইল অনুতাপ আর অপরাধবোধে।

—না।

—তাহলে ক্ষতিপূরণের টাকাটা কত লাগবে? আমি... পরে তোমাকে দিয়ে দেব।

—আমাকে দিয়ে দেবে?

লুয়ে নিচু চোখে নানতাওর দিকে তাকাল। মেজাজ ভালো থাকায় একটু বেশি খুলেই বলল, —প্রতিটা গাড়ির পূর্ণ ক্ষতিপূরণ আর পরের জনসংযোগের খরচ মিলিয়ে ধরে দুই মিলিয়নের মতো।

—পাঁচ মিলিয়ন!

নানতাও চমকে উঠল। তবে ভাবল, ওটা তো এক ডজনেরও বেশি গাড়ির শৃঙ্খলাবদ্ধ ধাক্কাধাক্কি; ভাগ করে দেখলে অঙ্কটা প্রায় মেলেই যায়। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, —এখনই হয়তো পাঁচ মিলিয়ন দিতে পারব না। তবে যখন জোগাড় হবে, আমি তোমাকে দেব।

সে যদিও নিজের কোম্পানি চালাত, কিন্তু বেশির ভাগ টাকাই তো খরচ হয়ে যেত... সেই লোকগুলোর ওপর।

তার আর্থিক অবস্থা আসলে বেশ টানাটানির মধ্যেই ছিল।

স্ত্রীলোকটা এমন জেদ ধরে আর্থিক হিসাব মেলাতে চাওয়ায় লুয়ের চোখের দৃষ্টি একটু নেমে এল। হাসি-হাসি স্বরে বলল, —এক মুহূর্ত আগে আমায় নিয়ে খেলছিলে, আর পরমুহূর্তেই হিসাব কষতে বসলে? তাওতাও, তুমি বড় নিষ্ঠুর।

—আমি নিষ্ঠুর কোথায়? আমি তো সৎ আর ন্যায়বান বলেই তোমাকে টাকা দিচ্ছি।

নানতাও লুয়েকে একবার কড়া চোখে দেখল। —যাই হোক, আমি দেবই। লিখে রাখো, পাঁচ মিলিয়ন।

—লিখে রাখতেই হলে, তুমি যে কায়েনটা ঠুকে ভেঙেছিলে সেটাও তো আমি কিনেছিলাম। সেটাও কি একসঙ্গে ধরা হবে?

নানতাও: —...

লোকটার কৌতুকমাখা দৃষ্টির সামনে সে শুধু নিচের ঠোঁটটা আলতো করে কামড়ে ধরতে পারল। —তাহলে একসঙ্গেই লিখে রাখো।

—তাহলে তো আমাকে গু চিকে একটা মোটা খাতা কিনতে বলতে হবে।

লুয়ে নানতাওকে গাড়িতে বসিয়ে দিল। আগের মতোই যত্ন করে সিটবেল্ট বেঁধে দিল। কাজ শেষ করে তার সরু, উজ্জ্বল আঙুল নানতাওর গাল বেয়ে হালকা ছুঁয়ে গেল, তারপর তার গালের গর্তের ওপর আলতো টোকা দিল।

—বোকা হয়ো না। আমার টাকা মানেই তোমার টাকা।

লুয়ের সঙ্গে এ নিয়ে কথা কওয়া যে বৃথা, নানতাও আর কিছু বলল না। দুহাত দিয়ে বুকের ওপর শক্ত করে বাঁধা সিটবেল্টটা চেপে ধরল শুধু। মনের ভেতর সে ইতিমধ্যেই এক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল।

লুয়ে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতাল ছেড়ে বেরিয়ে গেল। কিন্তু কোথায় যাচ্ছে, নানতাও বুঝতে পারল না।

মনে হচ্ছিল শহর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, কিছুটা যেন উত্তর নগরের দিকেই।

পশ্চিম নগরে টানা দশ বছর থাকার পরও নানতাও আগে কখনও উত্তর নগরে যায়নি।

তবে শেষ পর্যন্ত তারা উত্তর নগরেও পৌঁছল না। এসে থামল শহরতলির এক অচেনা জায়গায়। সেখানে ছিল এক পুরোনো বিনোদন উদ্যান, চারপাশের সারি সারি সুউচ্চ দালানের সঙ্গে যার কোনো মিলই ছিল না।

জনাকীর্ণ এলাকায় বিনোদন উদ্যান থাকা অবশ্য অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু তার চারপাশ দিয়ে অল্পটা পথ পেরোতেই নানতাওর মনে হলো, জায়গাটা কেমন যেন অদ্ভুত। ভেতরের নানা রাইড আর খেলনা যেন ভাঙাচোরা নয়, বরং সেকেলে হয়ে পড়েছিল।

লুয়ে গাড়ি উদ্যানের ফটকের সামনে থামাল। নেমে না এলেও নানতাও ওপরের বড় বড় অক্ষরগুলো পড়ে ফেলল—“ছোট শঙ্খনিনাদ আনন্দ উদ্যান”। শব্দগুলো পড়ামাত্রই তার মনে বিদ্যুৎ খেলে গেল।

ছোট শঙ্খনিনাদ আনন্দ উদ্যান।

লুয়েকে এখান থেকেই তুলে নিয়ে গিয়েছিল।

এই ছয়টি শব্দ লুয়ে নিজে কখনো উচ্চারণ করেনি; নানতাও এগুলো পরে নানা পুরোনো খবরের কাগজ পড়ে জেনেছিল।

সে ভাবতেই পারেনি, এই উদ্যান এখনও রয়ে গেছে, আর এভাবে এতখানি অক্ষত অবস্থায়ও টিকে আছে।

লুয়ে গাড়ি থেকে নেমে নানতাওকে কোলে নিয়ে সামনের আসন থেকে নামাল।

—আমাকে নামিয়ে দাও, ধরে ধরে হাঁটলেই হবে।

লুয়ের পায়ের গোড়ালিতে আগে থেকেই টান লেগেছিল ভেবে নানতাও নড়েচড়ে নামতে চাইল। কিন্তু লুয়ে তাকে শক্ত করে আটকে রাখল।

—আমার নিজের মানুষটাকে কি হাঁটিয়ে নিতে হবে? তাওতাও, তুমি আমাকে ছোট করে দেখছ।

বলে সে রাগে-অভিমানে যেন আরও দ্রুত তাকে বুকে নিয়ে এগিয়ে চলল।

সোনালি আলো তখন পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েছে। ফাঁকা, এমনকি টিকিট বিক্রেতা আর প্রহরীহীন সেই উদ্যানের ভেতরে ঢুকতেই নানতাওর কেমন যেন ঘোর লাগল। মনে হলো, যেন এই সোনালি আলোর ভিতর দিয়ে সে হঠাৎ করে দুই দশকেরও বেশি সময় পেছনে ফিরে গেল।

—লুয়ে, এই বিনোদন উদ্যানটা... —দ্বিধা আর সংকোচ নিয়ে নানতাও প্রশ্ন করল।

লুয়ে নির্লিপ্তভাবে হাঁ বলে উঠল। —দশ বছর আগে আমি এটা কিনে নিয়েছিলাম। আমাকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার ঘটনার পরও লোকটা এখানে আরও পনেরো বছর চালিয়েছে। মোটামুটি আমি নিখোঁজ হওয়ার সময়ের মতোই সবকিছু রয়ে গেছে।

এই দশ বছরে সে এই বিনোদন উদ্যান কিনে নিয়েছিল, তারপর জায়গাটা সিলগালা করে দিয়েছিল। এটাই হয়ে উঠেছিল সত্যিকারের হারানো উদ্যান। তবে জায়গাটা আগের মতোই রেখে দেওয়ার জন্য লুয়ে প্রতি বছর টাকা ঢেলে লোক লাগিয়ে এর মেরামত আর রক্ষণাবেক্ষণ করাত।

যতই ঝড়-জল আসুক, সময় যতই বয়ে যাক, এখানে সবকিছু তার স্মৃতির ভেতরের মতোই রয়ে গেছে—পঁচিশ বছর আগের মতো।

—কিন্তু কেন?

নানতাও বুঝতে পারল না। এখানে সে কীভাবে ঘৃণা করবে না? এ তো তার জীবনের সব যন্ত্রণার সূচনাস্থল। তাকে তো এটা ধ্বংস করে ফেলা উচিত ছিল, আগলে রাখা নয়।

লুয়ে নানতাওকে তুলে নিয়ে গিয়ে ছোট উদ্যানের এক বেঞ্চে বসাল।

বেঞ্চের উল্টোদিকে ছিল দোলনাজাহাজের রাইড, পেছনে ক্যারোসেল।

পুরোনো বেঞ্চে অসংখ্য আঁচড়ের দাগ। পায়ের নিচের ঘাসের জমিন শরতের আগমনে হলদে হয়নি দেখে নানতাও ভালো করে তাকিয়ে বুঝল, ঘাসটা আসলে প্লাস্টিকের।

—লুয়ে...

—কারণ পঁচিশ বছর আগের সেই দৃশ্যটাকে আমি বারবার, অগণিতবার পুনরাবৃত্তি করলেই শুধু সম্পূর্ণ স্মৃতিটা জোড়া লাগাতে পারি। এক বিশাল ষড়যন্ত্রে মোড়া স্মৃতি।